ট্রেন্ডিং
ডাটা প্রস্তুত করা হচ্ছে......
বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং অধ্যায় শেষের পথে | Standard Chartered’s Retail Banking Chapter Nears its End in Bangladesh

বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং অধ্যায় শেষের পথে | Standard Chartered’s Retail Banking Chapter Nears its End in Bangladesh

 

বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং অধ্যায় শেষের পথে | Standard Chartered’s Retail Banking Chapter Nears its End in Bangladesh

কিছু প্রতিষ্ঠান কেবল তাদের সেবা দিয়ে মানুষের জীবনে জায়গা করে নেয় না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে ওঠে আস্থা, নির্ভরতা ও অবিচল আস্থার প্রতীক। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (Standard Chartered Bank) ঠিক তেমনই একটি নাম।

সম্প্রতি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ তাদের বৈশ্বিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেশের ওয়েলথ ও রিটেইয়েল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির সম্ভাবনা যাচাই করার ঘোষণা দিয়েছে। খবরটি নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠানটির বহু গ্রাহকের মনে বিষণ্নতা তৈরি করেছে। কারণ, এটি শুধু একটি ব্যাংকের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, দীর্ঘদিনের পরিচিত একটি ব্যাংকিং অভিজ্ঞতার পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সাথে বাংলাদেশের সুদীর্ঘ সম্পর্ক
Standard Chartered’s Longstanding Relationship with Bangladesh

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বাংলাদেশের ইতিহাস এক দিনের নয়। বাংলাদেশ তাদের উপস্থিতির ইতিহাস ১৯০৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত, যা Grindlays Bank এর ঐতিহাসিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড নিজস্ব শাখা চালু করে। ২০০০ সালে Grindlays Bank অধিগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের সেই দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং ঐতিহ্যকে নিজেদের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করে। ২০০৬ সালে American Express Bank এর বাণিজ্যিক ব্যাংকিং ব্যবসাও অধিগ্রহণ করে।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এই প্রতিষ্ঠানের পথচলা শুধু কয়েক দশকের নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিস্তৃত একটি ইতিহাস।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের অবদান
Standard Chartered’s Contributions to Bangladesh’s Banking Sector

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের অবদান শুধু কনজ্যুমার ব্যাংকিং সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যাংকটির প্রকাশিত ইতিহাস অনুযায়ী, স্বাধীন বাংলাদেশে ঋণসুবিধা প্রদানকারী প্রথম আন্তর্জাতিক ব্যাংক হিসেবে তারা ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭২ সালে দেশের প্রথম বৈদেশিক লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) খোলার কৃতিত্বও প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের বলে উল্লেখ করে।

এ ছাড়া এটিএম, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, আন্তর্জাতিক ডেবিট কার্ড, ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড, সর্বক্ষণিক কল সেন্টার এবং অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মতো সেবা চালুর ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অগ্রণী ভূমিকার কথা তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক লেনদেন, করপোরেট অর্থায়ন ও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায়ও ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের কার্যক্রম রয়েছে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রাখার ক্ষেত্রে এমন একটি বৈশ্বিক ব্যাংকের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রাহকদের কাছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড কেন আলাদা ছিল?
Why was Standard Chartered Different for its Customers?

ব্যাংকিং সেবা মানে শুধু অর্থ জমা রাখা, উত্তোলন করা কিংবা কার্ড দিয়ে কেনাকাটা করা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিরাপত্তার অনুভূতি, সেবার মান, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি দীর্ঘদিনের বিশ্বাস।

অনেক গ্রাহকের কাছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের লোগোটি ছিল সেই নির্ভরতারই প্রতীক। ব্যাংকটির কার্ড, ডিজিটাল ব্যাংকিং, প্রিমিয়াম সেবা কিংবা দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেন, সব মিলিয়ে অনেকের জীবনে প্রতিষ্ঠানটি একটি পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে উঠেছিল।

ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছেও এই নামটির আলাদা একটি মূল্য রয়েছে। পরিচিত সেই লোগোটি দেখলে যে আস্থা ও প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি হয়, তা কেবল একটি ব্যাংকিং পণ্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে, আর কিছু প্রতিষ্ঠান সেই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।

রিটেইল ব্যাংকিং থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের অর্থ কী?
Understanding Standard Chartered’s Retail Banking Exit

৮ অক্টোবর ২০২৬ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ গ্রাহকদের অফিশিয়ালি ইমেইলের মাধ্যমে জানিয়েছে, তারা তাদের রিটায়েল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির সম্ভাবনা যাচাই করছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যাংকটি বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণভাবে চলে যাচ্ছে।

ব্যাংকটি কর্পোরেট এন্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত মূলধন প্রবাহ এবং অবকাঠামো অর্থায়নের মতো ক্ষেত্রে তাদের মনোযোগ বাড়াতে চায়। সম্ভাব্য লেনদেনটি নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ঘোষণার সময় ব্যাংকটি জানিয়েছিল, এ সিদ্ধান্তের ফলে গ্রাহকদের সেবায় তাৎক্ষণিক পরিবর্তন হবে না এবং প্রক্রিয়া চলাকালে কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকবে। 

আমি ব্যক্তিগতভাবে এই পুরো বিষয়টিকে যদি ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তাহলে এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু গ্রাহকের অনুভূতির জায়গা থেকে দেখলে, দীর্ঘদিনের পরিচিত রিটেইল ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা বদলে যাওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে আবেগের।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং, বিদায়ের আবেগ, অবদানের উত্তরাধিকার 
SCB Retail Banking, The Emotion of Farewell, A Legacy of Contributions

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের কার্যক্রমের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই উদ্যোগ। ব্যাংকটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কৃষকদের সহায়তা, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো বিভিন্ন উদ্যোগে তারা অংশ নিয়েছে।

জীবন খেয়া ভাসমান হাসপাতাল উদ্যোগে অর্থায়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান-উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তার মতো কার্যক্রমও তাদের সামাজিক সম্পৃক্ততার অংশ। 

একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু তার মুনাফা দিয়ে বিচার করা যায় না, দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং মানুষের জীবনে তার দীর্ঘমেয়াদি অবদানও গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং, সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান বদলায়, ব্যবসায়িক কৌশল বদলায়, বদলে যায় সেবার ধরনও। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই সিদ্ধান্তও হয়তো সেই পরিবর্তনেরই অংশ এমনটিই মনে হয়েছে আমার কাছে। আমিতো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের অতি ক্ষুদ্র একজন গ্রাহক ছিলাম, যাঁরা বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ব্যাংকিং করেছেন, তাঁদের কাছে এই পরিবর্তনের একটি ব্যক্তিগত অর্থ রয়েছে।

হয়তো ভবিষ্যতে আগের মতো করে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যাবে না। হয়তো দৈনন্দিন লেনদেনে পরিচিত সেই লোগোটি আর আগের মতো চোখে পড়বে না। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, আস্থা এবং স্মৃতির জায়গাটি এত সহজে মুছে যাবে না। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাদের এই দীর্ঘ পথচলা, উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদানের জন্য রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য রইল শুভকামনা। আশা করি, বাংলাদেশের প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার অটুট থাকবে এবং দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে।

এসএম শামীম হাসান 
হেড অব কনটেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি, ব্যাংকিং মার্ট
ইমেইল: shamiminsider@gmail.com 

তথ্যসূত্র: 

The Daily Star 
The Business Standard
Standard Chartered Bangladesh 


0 Comments: